[1]
শীতের সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন আলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধাশ্রমের জানালা দিয়ে প্রবেশ করছিল। রাহেলা বানু তার ছোট্ট কক্ষের জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিলেন। তার চোখে এখনো স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেবে না। তিনি জানতেন।
"আজ কি বাচ্চারা আসবে?" তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন। উত্তর জানা সত্ত্বেও প্রতিদিন একই প্রশ্ন নিজেকে করতেন। আট সন্তানের মা তিনি, কিন্তু কেউ আসে না।
[2]
রাহেলা বানুর গল্প শুরু হয়েছিল অনেক বছর আগে। স্বামী যখন মারা গেলেন, তখন তিনি মাত্র ৩২ বছর বয়সী। আট সন্তান নিয়ে একা পড়ে গেলেন। তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়ে। সবচেয়ে বড় সন্তানের বয়স মাত্র ১৪ বছর, আর সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স মাত্র ৩ বছর।
"কীভাবে এই সন্তানদের বড় করব?" - এই প্রশ্ন তাকে সারারাত জাগিয়ে রাখত। কিন্তু তিনি হার মানেন নি। স্বামীর সামান্য সঞ্চয় নিয়ে একটি ছোট্ট মুদির দোকান খুললেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানে বসতেন। রাতে বাড়ি ফিরে সন্তানদের যত্ন নিতেন। নিজের খাওয়া-পরার চিন্তা না করে তিনি সন্তানদের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন।
"তোরা লেখাপড়া করবি, মানুষ হবি। আমি চাই না তোরা আমার মত কষ্ট করিস।" - এই কথা প্রতিদিন সন্তানদের বলতেন রাহেলা বানু।
[3]
বছরের পর বছর কেটে গেল। রাহেলা বানু দিনরাত পরিশ্রম করে সন্তানদের পড়ালেখা চালিয়ে নিয়ে গেলেন। নিজের সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য, সবকিছু বিসর্জন দিলেন সন্তানদের জন্য। তার হাতের রেখাগুলো গভীর হয়ে গেল, চুলগুলো সাদা হয়ে এল, চোখের নীচে কালো ছায়া পড়ল। কিন্তু তিনি হাসতেন যখন দেখতেন তার সন্তানরা পড়াশোনায় ভালো করছে।
তার তিন ছেলে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হল। বড় ছেলে বিদেশে চলে গেল উচ্চ পড়াশোনার জন্য। মেজো ছেলে একটি বড় কোম্পানিতে চাকরি পেল। সবচেয়ে ছোট ছেলে ব্যবসায় নাম করল। তার পাঁচ মেয়েও ভালো পরিবারে বিয়ে হল। সবাই শ্বশুরবাড়িতে সুখে ছিল।
রাহেলা বানু গর্বিত ছিলেন। তার জীবনের সাফল্য ছিল তার সন্তানদের সাফল্য। কিন্তু তিনি জানতেন না যে সাফল্যের সাথে সাথে তার সন্তানরা তাকে ভুলতে শুরু করেছে।
[4]
রাহেলা বানু যখন ষাটের কোঠায়, তখন তার ছোট দোকানটি আর চালাতে পারলেন না। চোখে কম দেখতেন, হাতের কম্পন বেড়ে গিয়েছিল। ভাবলেন এবার ছেলেদের কাছে যাবেন। বড় ছেলের বাড়িতে গেলেন।
"মা, আমার বাড়িতে জায়গা নেই। তুমি মেজো ভাইয়ের কাছে যাও," বড় ছেলে বলল।
মেজো ছেলের বাড়িতে গেলেন।
"মা, আমার স্ত্রী তোমাকে পছন্দ করে না। তুমি ছোট ভাইয়ের কাছে যাও," মেজো ছেলে বলল।
ছোট ছেলের বাড়িতে গেলেন।
"মা, আমি ব্যস্ত থাকি। তোমার যত্ন নেওয়ার সময় নেই আমার। তুমি দিদিদের কাছে যাও," ছোট ছেলে বলল।
একে একে পাঁচ মেয়ের কাছে গেলেন। সবাই নানা অজুহাত দেখিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিল। যে রাহেলা বানু সন্তানদের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই রাহেলা বানু আজ সন্তানদের কাছে বোঝা।
[5]
শেষ পর্যন্ত তার ছেলেরা মিলে একটি বৃদ্ধাশ্রমে তাকে রেখে এল। মাসে একবার টাকা পাঠাতো, কিন্তু দেখা করতে আসত না। রাহেলা বানু বৃদ্ধাশ্রমের একটি ছোট কক্ষে থাকতেন। জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখতেন। মাঝে মাঝে ভাবতেন, তার সন্তানরা কেমন আছে? তাদের বাচ্চারা কেমন বড় হচ্ছে? তিনি কখনো তার নাতি-নাতনিদের দেখেন নি।
রাহেলা বানু প্রতিদিন সন্তানদের জন্য প্রার্থনা করতেন। তাদের প্রতি কোনো রাগ ছিল না। শুধু একটু কষ্ট ছিল যে, যে সন্তানদের জন্য তিনি সবকিছু দিয়েছেন, সেই সন্তানরা তাকে একটু স্থান দিতে পারল না।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে রাহেলা বানু একটি ছোট ঝুড়ি সাজিয়ে রাখতেন। সেই ঝুড়িতে রাখতেন তার স্বামীর ছবি, সন্তানদের ছোটবেলার ছবি, কিছু চিঠি, আর তার নিজের কিছু স্মৃতি। এই ঝুড়িটি ছিল তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
[6]
একদিন সকালে বৃদ্ধাশ্রমের কর্মীরা দেখল রাহেলা বানু তার বিছানায় শান্তভাবে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন। তার পাশে ছিল সেই ঝুড়িটি, যেখানে তিনি তার জীবনের সব স্মৃতি সাজিয়ে রেখেছিলেন।
খবর পেয়ে তার সব সন্তান এল। সবাই কাঁদল। কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না। রাহেলা বানু তার দুঃখ, বেদনা, আর স্মৃতির ঝুড়ি নিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রধান রাহেলা বানুর সন্তানদের বললেন, "তোমাদের মা প্রতিদিন জানালার পাশে বসে তোমাদের অপেক্ষা করতেন। তিনি কখনো তোমাদের নিন্দা করেন নি। শুধু বলতেন, 'আমার বাচ্চারা ব্যস্ত, তাই আসতে পারে না।'"
সন্তানরা তখন বুঝতে পারল তাদের ভুল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। রাহেলা বানু তার বেদনার ঝুড়ি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
রাহেলা বানুর জীবনের গল্প শুধু একজন মায়ের ত্যাগের গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজের এক করুণ বাস্তবতার প্রতিফলন। প্রতিদিন কত রাহেলা বানু নিঃসঙ্গতায় দিন কাটাচ্ছেন, কত মা-বাবা সন্তানদের দেখার আশায় জানালার পাশে বসে থাকেন।
যারা আজ বৃদ্ধাশ্রমে আছেন, তারা শুধু বৃদ্ধ নন, তারা একসময় তাদের সন্তানদের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের কাছে টাকার চেয়ে মূল্যবান ছিল সন্তানদের ভালোবাসা। কিন্তু যখন সেই ভালোবাসা পেলেন না, তখন তাদের হৃদয় ভেঙে গেল। রাহেলা বানুর মতো অনেকে বেদনার ঝুড়ি নিয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।


