সকাল আটটা।রাতভর অঝোর বৃষ্টিতে ভোরের আকাশ যেন একটু ক্লান্ত। মেঘগুলো তখনো জমাটবদ্ধ হয়ে ছুটছে। টিনের চালা থেকে ছেচের সামনে টুপটাপ শব্দে বৃষ্টি পড়ছে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে উঠানে কাদার মধ্যে ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানি নড়েচড়ে উঠছে। এমন সকালে স্কুলে যাওয়ার তাড়া থাকে না কারও, তবু যেতে হয়, কারণ শৈশবে দায়বদ্ধতা মানে ভয়, আর ভয়ের মধ্যেই থাকে নিয়ম।
রাফি বের হলো বাড়ি থেকে। তিনটা পুরনো বই আর দুটো পাতলা খাতা এক হাতে, আরেক হাতে একটা বড় কচুর পাতা মাথার উপরে ধরা। ওটাই আজকের ছাতা। পরনে ময়লা আকাশী রঙের হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট, পায়ে কিছু নেই। খালি পা কাদার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এগোচ্ছে, যেন কাদা আর পায়ের মধ্যে কোনো পুরনো চুক্তি আছে। রচি আর সজলের বাড়ির দিকে যেতে যেতে কাদা রাস্তা আরও নরম হয়ে উঠল। ওদের ডাক দিল রাফি। একজন প্রথমে বের হল, তারপর আরেকজন। তিনজন একসাথে হাঁটা শুরু করল। তিন মাথায় তিনটা কচুর পাতা, যেন বর্ষার ভেতর শৈশবের এক বিচিত্র মিছিল। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ, দূরে ব্যাঙের ডাক, আর সেই ব্যাঙের ডাককে ভাঙ্গাইতে ভাঙ্গাইতে তিন বালকের নির্ভাবনায় ছুটে চলা পায়ের শব্দে মিশে ছিল এক অচেনা মধুরতা, যার কোনো নাম তখনো তারা জানত না
ওরা ছিল দুষ্ট । তবে দুষ্টুমি ছিল ওদের ভাষা, যাতে ভয়, আনন্দ, স্বাধীনতা সবকিছু মিশে যেত তাতেই। সেদিনই নাম ডাকার সময় বাবু স্যার খেয়াল করলেন অমিত নেই। টানা পাঁচ দিন ধরে নেই।রাফি, রচি, সজল আর অমিত চারজন একসাথে বসে, একসাথে হাসে, একসাথে দোষ করে। ক্লাসের বেঞ্চে ওরা পাশাপাশি না থাকলে কিছু একটা খালি লাগে ক্লাসের।
বাবু স্যার চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন-
“রাফি, রচি, সজল তোরা তিনজন যা। অমিতের খোঁজ নিয়ে আয়। যদি অকারণে স্কুলে না এসে থাকে তবে সাথে করে ধরে নিয়ে আসবি”
তিনজন বের হল স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে। মাঝপথে এসে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল রাফি।
“দোস্ত.. ঐ দেখ!”
খালের ধারে পানিতে ফুটে আছে শাপলা। সাদা, নীল যেন বৃষ্টিতে ধোয়া, একেবারে নতুন। শৈশব খুব অদ্ভুত,যেখানে কর্তব্যের চেয়ে সৌন্দর্য সবসময় বড় হয়।
“চল, শাপলা তুলি।”
রাফির চোখে তখন স্কুল নেই, স্যার নেই, শুধু পানি আর ফুল। রচি থমকে বলল,
“তাহলে অমিতের বাড়ি যাবে কে? স্যারকে কী বলব?”
সজল একটু চুপ করে থেকে বলল,
“সেটা কাল দেখা যাবে। আজ তো শাপলা তুলি আগে।”
এই “কাল” নামের শব্দটা তখন খুব সহজ ছিল। ওরা জানত না। সব কালের জন্য সময় একরকম থাকে না। শাপলা তুলতে তুলতে সময় গড়িয়ে গেল। ঢ্যাপও তোলা হলো। সারাদেহ কাদা-পানি হয়ে গেল। মাথার ওপর আকাশ তখন একটু পরিষ্কার, কিন্তু ওদের ভেতরের আকাশে কোনো মেঘ ছিল না কারোরই।
স্কুলে ফেরার অনেক আগেই বেজে গেছে ছুটির ঘন্টা। তাই ভাঙা জানালা দিয়ে ক্লাসে ঢুকে বই নিয়ে বাড়ি ফিরল। স্কুলে কোনোপ্রকার কৈফিয়ত ছাড়াই সেদিনটা পার হয়ে গেল। কিন্তু পার হলো না পরদিন । বেশ দেরি হওয়ার কারণে পরদিন সকালে ওরা দৌড়াতে দৌড়াতে স্কুলে পৌঁছাল।
নাম ডাকা শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। ক্লাসে ঢুকেই চোখে পড়ল, অমিত সামনের বেঞ্চে বসে আছে।
“স্যার, আসতে পারি?”
রচির গলা কাঁপছিল।
বাবু স্যার চশমার উপর দিয়ে তাকালেন। ওই তাকানোটা শৈশবের সবচেয়ে ভারী তাকানো।
“আয়।”
নাম ডাকা শেষ হতেই বাবু স্যার বললেন,
“রাফি, তোরা তিনজন দাঁড়া।”
ক্লাসরুম হঠাৎ খুব ছোট হয়ে গেল মনে হলো। পা দুটো যেন মেঝে ছুঁয়ে নেই।
“কাল তোরা অমিতের বাড়ি না গিয়ে কোথায় গিয়েছিলি?”
রাফির মুখ শুকিয়ে গেল। ভয় তখন কেবল মাথার ভেতর নয় বরং কথাও গলায় এসে আটকে যায়।
“স্যার… মাঝপথে একটা কুকুর তাড়া করছিল। ভয়ে আমরা খালে লাফ দিয়েছিলাম।”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর-
“মিথ্যা কেন বলছিস!”
বাবু স্যারের গলা যেন বেতের মতো আছড়ে পড়ল। রাফির কথা জড়িয়ে গেল। রচি আর সজলের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি বেরিয়ে এলো। কখন যে ওরা কান্না শুরু করছে বোঝা গেল না। সেদিনের পর রাফি তিন দিন স্কুলে যায়নি।
রাফি আবার স্কুলে ফিরেছিল। তিন দিন পর, একটু চুপচাপ হয়ে। দুষ্টুমি কমেনি, শুধু শব্দটা নিচু হয়ে গিয়েছিল। শৈশব এমনই, ভয়ও কয়েক দিনের বেশি টেকে না। ছুটির ঘণ্টা বাজলেই সবকিছু পাল্টে যেত। ক্লাসরুমের দেয়াল পার হয়েই সোজা মাঠে, যেন স্কুলের মাঠ তাদের সদ্য জয় করা একটা স্বাধীন রাষ্ট্র। কখনো বৌচু, কখনো গোল্লাছুট। দৌড়াতে দৌড়াতে শ্বাস কেটে যেত, তবু থামার কথা মাথায় আসত না। কাদায় পড়ে জামা নোংরা হলে কেউ কিছু বলত না, কারণ বিকেলটা ছিল কেবলই ওদের। সজল সবচেয়ে জোরে দৌড়াত। হাসতও সবচেয়ে বেশি। যেন ও জানত এই হাসির দিনগুলো বেশি দিন থাকবে না। সুযোগ পেলেই ওরা ঢুকে পড়ত মোল্লার বাগানে। আম, চেরি, খই আর সবার প্রিয় তেঁতুল পাড়তে । টক স্বাদে মুখ কুঁচকে গেলেও খাওয়া থামত না, বরং একরকম বিজয়ের আনন্দ হতো। চুরি তখন অপরাধ নয় যেন অনুসন্ধান। একদিন সেই তেঁতুলই ডেকে আনল আরেক ঝামেলা।
খাইরন আপার ক্লাস। ওরা চারজন বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে তেঁতুল ভাগ করছিল। গুনে গুনে ভাগ—কে বেশি পেল, কে কম। শেষ পর্যন্ত রাফির ভাগে একটু কম পড়ল। রাফি মুখ বাঁকাল। ওরা তিনজন চুপিচুপি হাসল। ঠিক তখনই খাইরন আপা এসে দাঁড়ালেন। ক্লাসরুম হঠাৎ থমকে গেল।
তেঁতুল তখন আর কেবলই তেঁতুল নয়, এ তো অপরাধের জলজ্যান্ত প্রমাণ। আপা কিছু বললেন না। শুধু তেঁতুল গুলো হাতে নিয়ে চারজনের দিকে তাকালেন। সেই তাকানোতে রাগ ছিল না ,আস্তে করে হেঁসে বললেন।
“ এখন ক্লাসের সবাই সমান পাবে,”
বলেই পুরো ক্লাসে ভাগ করে দিলেন। ক্লাসের সবাই খুশিতে চেঁচাল। আর ওরা চারজন সমান তালে মুখ ভেংচাল।
শৈশব এমনই, একজনের মুখ ভেংচি যেন অন্যদের জন্য তার সীমাহীন আনন্দের খোরাক। সময় থেমে থাকেনি। ক্লাস পাল্টেছে, বই পাল্টেছে, ওরা উঠে গেছে চতুর্থ শ্রেণীতে।
তারপর একদিন- স্কুল চলাকালীন হঠাৎ খবর এল। সজলের বাবা মারা গেছে। খবরটা ঠিক বুঝে ওঠার আগেই সবাই সজলের বাড়ির দিকে ছুটল। উঠানে ভিড়, কান্না, আহাজারি । সজল চুপ করে বসে ছিল। চোখে জল নেই, শুধু তাকিয়ে আছে। ওর ছোট বোন মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে কাঁদছে। ওর মা তখন কথা বলছেন না, চোখ খোলা তার কিন্তু কোথাও যেন তিনি নেই। সেদিনের পর থেকে সজল আর স্কুলে এলো না। প্রথমে সবাই ভাবল, অনেক কষ্ট পাওয়ায় আসতেছে না। তারপর দিন গেল, সপ্তাহ গেল। একদিন রাফি আর রচি দেখল ধানক্ষেতে কাজ করছে সজল । মাথায় গামছা, হাতে কাস্তে। চোখে ক্লান্তি, মুখে বয়সের আগেই নেমে আসা কঠোরতা।
“স্কুলে আসিস না কেন?”
রচি জিজ্ঞেস করেছিল। সজল কিছু বলেনি। শুধু কাস্তেটা আরেকটু শক্ত করে ধরে হেঁসে বলেছিল
"কাজ আছে রে অনেক, পরে কথা হবে।"
ওর স্কুলব্যাগটা আর কোনোদিন কাঁধে ওঠেনি। বইখাতা হয়ে রইল তাকের কোণে এক নীরব সাক্ষী।
কচুর পাতা আর মাথায় ওঠে না। বর্ষা আসে, বৃষ্টি নামে, কিন্তু ওর আর স্কুলে যায় না কাদা মাড়িয়ে। ছোট বোনের ক্লাস টু তে পড়ানো ও মায়ের ভাঙা মনকে সান্ত্বনা, এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সজল বেছে নিয়েছিল পড়াশোনাকে নয়, নিয়েছিল বাস্তবতায়পূর্ণ দায়িত্বশীল এক জীবনকে। সেখানেই ওর শৈশবের পরিসমাপ্তি। যার সমাপ্তিতে কোনো ঘণ্টা বাজেনি। হয়ননি কোনো ঘোষণাও।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। যার মাঠে একসময় দৌড়াতে দৌড়াতে শ্বাস আটকে আসত, সেখানে এখন শুধু দুপুরের রোদ পড়ে থাকে। স্কুলের ঘণ্টা আগের মতোই বাজে, কিন্তু ডাকার মানুষগুলো বদলে যায়। সজলের সঙ্গে এখনো দেখা হয় রচিদের সাথে কিন্তু সেই দেখা আর আগের দেখা নয়। কখনো ধানক্ষেতে, কখনো মসুরির ক্ষেতে, কখনো কারো বাড়ির উঠোনে মাথায় বোঝা তুলে হাঁটার সময়। চোখে চোখ পড়লে কথা হয় না, শুধু মাথা নেড়ে নেওয়া, যেন ওরা পরস্পরকে জানে, বলার মতো অনেক কিছু আছে, আবার বলার মতো জায়গা যেন নেই।
পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা শেষ হলো। রচি, রাফি আর অমিত পাস করল ভালো নম্বরে। রাফি শহরে চলে গেল, দূর সম্পর্কের এক কাকার বাড়ি। শহরের স্কুলে ভর্তি হলো। কংক্রিটের ভেতর বৃষ্টি আর কাদা থাকে না, থাকে শুধু তাড়া। ছুটে চলার তাড়া। অমিত গ্রামেই রয়ে গেল। তবে স্কুলটা বদলে গেল। রচি ছাড়ল পড়ালেখা। দারিদ্র্য কোনো ঘোষণা দেয় না বরং একদিন সামনে এসে বন্ধ করে দেয় চোখের পাপড়িতে জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলোর রঙিন সব দরজা।
চারজন চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। সময়ের স্রোত টেনে নিয়ে গেছে তাদের। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর এসেছে ওদের সবার। শৈশবের সব দুরন্তপনাও সাঙ্গ হয়েছে। দিনশেষে, ঘুমানোর আগে মাথা বালিশে ঠেকিয়ে ঠিকই একে অপরের কথা মনে করে ওরা। নিষ্ঠুর সময় আর বিস্তর ব্যবধানে আর কখনো জড় হওয়া হয়নি চারটি হৃদয়ের। দুই ফোঁটা অশ্রু বালিশে ঠিকই গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু বালিশও সেই অশ্রু আধারের লুকোচুরিতে শুষে নেয় নিষ্ঠুরভাবে।
অসমাপ্ত......


