পুনরাবৃত্তি
মোঃ আশিক মোস্তফা
বাবা দিবসের বিশেষ লেখাঃ-
[১]
বৈশাখের ৭ম দিন আজ। চারদিকে ধান গোছানোই ব্যস্ত সবাই। জমির ও তার স্ত্রী সকাল থেকেই বেশ তাড়াহুড়ো করেই ধান গোছাচ্ছে। তাড়াহুড়ো না করেও তো উপায় নেই। এইতো তাদের একমাত্র প্রাপ্তি। সারা বছর অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে যা পায় তা দিয়েই দু' মুঠো ভাত তুলে দেয় পরিবারের মুখে। আকাশ কখনও মেঘলা হচ্ছে আবার কখনও তীব্র রোদ। প্রকৃতির এই খেলা বড্ড ভয় ধরাচ্ছে জমির মিয়ার মনে। অগ্যতা দ্রুতই সারছেন ধান গোছানোর কাজ। মালিহা বেগমেরও যেন কোনো ক্লান্তি নেই। নতুন ধান ঘরে এসেছে ।চোখে মুখে স্বস্তির আভাস। তবে এখন জিরিয়ে নেওয়ার জো নেই তার। দুপুরের পরই যে ধান ভাঁপাতে হবে।
বেশ দৌড়েই জমির মিয়ার ছোট ছেলে সাইম বাড়ির ওঠানে প্রবেশ করলো।
__ বাবা! বাবা! সাদ ভাইয়া ফোন করছিল কলিম কাকার কাছে। সে সামনে মাসে বাড়ি আসবে।তবে ভাইয়ার রেজিষ্ট্রেশন সহ প্রায় আট হাজার টাকা লাগবে। কালকের মধ্য
পাঠাতে বলেছে ভাইয়া।
__ সমস্যা নেই বাপ। আজকেই এই ধান বেইচা, কালকেই টাকা পাঠায় দিমু।
__ সেকি! আপনি এই ধান বেঁচবেন কেন? আমরা সামনের চার-পাঁচ মাস খাব কি?
বেশ উৎকন্ঠা নিয়েই বললেন মালিহা বেগম।যদিও জানেন তার এই কথার কোনো গুরুত্ব তিনি এই মুহুর্তে দিবেন না।
__ চিন্তা কইরো না মালিহা। ঠিকই একটা বিহিত হইয়া যাইবো। বাজানের জরুরী টাকা লাগবে। এখন ধান গুলো তাড়াতাড়ি গুছিয়ে দাও।বিকালে বেঁচতে বাজারে নিয়ে যাইবো।
[২]
বাইরে ঝুম বৃষ্টি নামছে।জানালার বাইরে একমনে তাকিয়ে আছে জমির মিয়া। বৃষ্টির এই দিনে এখন আর হাঁটতে ইচ্ছে করে না। শখও জাগে না মন খুলে দুই বাহু প্রসারিত করে ভিজতে। বৃদ্ধাশ্রমের এই বারান্দায় কেবলই মালিহা বেগমের স্মৃতিচারণেই দিন কাটে তার।
জমির মিয়ার দুই ছেলে আজ প্রতিষ্ঠিত। ছেলে-বউ এর কাছে বড্ড ভার হওয়ায় গত দুই বছর আগে তাদের আশ্রয় হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে। মালিহা বেগম বৃদ্ধাশ্রমের সরু পথ পানে চেয়ে চেয়ে এখানে আসার ছয় মাসের মাথায়ই পাড়ি জমান অচেনা পথের চিরচেনা গন্তব্যে। ছেলেদের কোনো খোঁজ মেলেনি কোথাও। মায়ের মৃত্যুর সংবাদও তাদের কে সরু এই পথটাতে ভুলেও আনতে পারিনি কখনও।
[৩]
যুগের হিসবে তিন পেরিয়েছে। আজও নেমেছে বৃষ্টি। বড্ড বেমানান এই প্রকৃতি। স্মতির পাতার স্খলন ঘটলেও দূর অতীতে হারিয়ে যাওয়া জীবনের পাতাগুলো যেন সজীবতা পায় দিনে দিনে। মনের ভিতরেই এসবই প্রতিফলিত হচ্ছে সাদ সাহেবের। কিছুক্ষণ আগে ঘরে এসে তার একমাত্র ছেলে তাকে তল্পিতল্পা গুছাতে বলে গেছে। যেতে হবে নতুন ঠিকানায়। যেখানে ভীড়ে আছে নিজ নিজ সংসারে অবহেলার দাহনে ঝরে যাওয়া হাজারো পাতা।
বৃষ্টির বেগটা হঠাৎ ই বেড়ে গেছে।
নাহ! ভিজতে আজ হবেই। স্ট্রেচারের উপর ভর করে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলেন বাড়ির বাইরের দিকে। আজকের অশ্রু গুলো না হয় বৃষ্টির সাথে বৃষ্টি হয়েই ঝরুক।
কিছুকথাঃ- পৃথিবীতে আত্নতৃপ্তি পূর্ণ কোনো চোখ যদি থাকে তা কেবল সন্তানের সুখে বাবা মায়ের চোখের আত্মতৃপ্তি। আসুন, যাদের জন্য এই পৃথিবীতে আগমন তাদেরকে অবহেলা নয়, জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালবাসি।


