জোনাকির জ্যোৎস্না

                                                       জোনাকির জ্যোৎস্না 

মোঃ আশিক মোস্তফা 


জোনাকির জ্যোৎস্না, ইসলামি গল্পের কথামালা



[১]

গ্রীষ্মের দাবদাহ রোদমাখা পড়ন্ত দুপুরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখ জুড়ে বসে পড়ে দ্বিগুণ ক্লান্তি। তলিয়ে নিয়ে যায় নিশিরাতের প্রশান্তিময় ঘুমের ঘোরের মতো।সারা এলাকা টো টো করে ঘুরে বেড়ানো কোনো কিশোরদল কেউ দেখা যায় না রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকা কোনো চায়ের দোকানের মাচায় বসে আড্ডা দিতে।প্রচন্ড তৃষ্ণায় কুকুরগুলোও হাঁপাচ্ছে। এই সময়ের এই প্রশান্তিময় ঘুমের মধ্যে মোবাইলের রিংটন বেজে ওঠা নেহায়েত তীব্র বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।স্বভাবতই চোখ না খুলেই তৃতীয় বারের মত ফোন কেটে দিয়ে পাশ ফিরে বালিশ উল্টিয়ে শুয়ে পড়ল তিহান।ফোনের ওপারের জন বোধ হয় নাছোড়বান্দা। টানা চতুর্থবারের মত ফোন বেজে ওঠায় চরম বিরক্তিতে আধঘুম পূর্ণ চোখ দুটি ফোনের স্ক্রিনে পড়তেই লাফিয়ে উঠে বসল তিহান।ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসল অভিমান ও অভিযোগ  মাখা কন্ঠস্বর। 

__ কিরে তিহান? তোরে এত বার ফোন দিই ধরিস না কেন? আজ ৮ম রমজান,তা কি ভুলে গেছিস? আমরা বটতলায় বসে আছি। আয় তাড়াতাড়ি।

কথা গুলো একদমে বলে উত্তরেই অপেক্ষা না করেই ফোন কেটে দিয়েছে সিয়াম।
ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে গোছানো শুরু করছে তিহান।রমজান শুরুর আগেই শফিক কাকা বলেছিল ৮ম রমজানে বটতলা মোড়ের মসজিদে ইফতার দিবেন।সেই জন্য সেখানকার সমস্ত পরিচালনার দায়িত্বও দিয়েছিল তিহানদের।এত বড় দায়িত্ব, অথচ খেয়ালই ছিল না , ভেবেই লজ্জা পায় তিহান।গোছানোর মধ্যেই তড়িঘড়ি করে ঘরে ঢুকল বিসমিকা।

কিরে ভাই এতো তাড়াতাড়ি গুছিয়ে কোথায় যাস?

__ বটতলা মসজিদে ইফতার মাহফিলে যাচ্ছি। 
__ ইফতার মাহফিল!  কিন্তু তুই তো রোজা নেই ভাই। 
একটু মুচকি হেসেই শেষ বাক্য টি বলল বিসমিকা।
১১বছর বয়সী ছোট বোনের কথার কোনো প্রতি উত্তর না দিয়েই বেরিয়ে পড়ল তিহান।

 

[২]

ইফতারের আর মাত্র ২০মিনিট বাকি আছে।সবাই ব্যস্ত যে যার দায়িত্ব পালনে। তিহানের দায়িত্ব পড়ছে শরবত বানানোর। শরবত বানানো শেষ হলেও একটি বিষয় তিহানকে বেশ সংশয়ে ফেলছে। শরবতে সে লবণ দিয়েছে কি না! একবার ভাবছে দিয়েছে আরেকবার ভাবছে দেয়নি। দুই রকম ভাবনারই সমান সম্ভাবনা তাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে।  অন্যদিকে সে রোজা না থাকা সত্বেও পরীক্ষা করে দেখতে পারছে না লোকলজ্জার ভয়ে। তিহানের প্রায় পাশেই ইফতার নিয়ে বসে থাকা এক ছোট ছেলেকে ডেকে শরবতের স্বাদ পরীক্ষার জন্য বললে, 
চমকে উঠে ছেলেটি।
__ কি বলেন ভাইয়া! আমি রোজদার, আমি কেমনে পরীক্ষা করব।
বলেই চলে গেল ছেলেটি।

চলে যাওয়ার দিকে বিস্মিত মনে ভাবতে লাগল তিহান। এইটুকু পিচ্চি।বয়স খুব বেশী হলে ৯-১০হবে।প্রচন্ড এই গরমেও সে রোজা।হঠাৎ মনে পড়ল বিসমিকার কথা।সেও সব কয়টা রোজা। অথচ সে সুস্থ থাকা সত্বেও রোজা পালন করছে না।

 

[৩]

২৭শে রমজান, বিকাল ৫ টা।আসরের আজান ভেসে আসছে দূরের মসজিদ থেকে। বিসমকাও তিহানের রুমে এসে।

__ ভাইয়া তাড়াতাড়ি ওঠ।আজান দিচ্ছে নামাজে যা।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় তিহানের রুমে এসে বলা কথা গুলো বিসমিকার জন্য নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। 
ঘুম ঘুম চোখে ওযু সেরে মসজিদের দিকে হাঁটছে তিহান। নিজের অজান্তেই মনের পাতায় ভেসে উঠল ৮ম রমজানের কথা।সেই ছেলের বলা কথা গুলি।সেই কথা তাকে সেদিন সাররাত ভাবিয়েছিল। সেদিনের আগ পযন্ত সে রোজা রাখিনি কখনও।মা বাবা রাখতে বললেও পড়াশোনা, পরীক্ষা বিভিন্ন অযুহাতে এড়িয়ে গেছে সে।সেই রাতে সে সে নেট থেকে সিয়াম সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছে। তারপরের দিন থেকে সে রোজা পালন করা শুরু করে, আর রোজা ছাড়েনি তিহান।আগে মাঝে মধ্যে শুধু জুমআর নামাজ পড়লেও এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই মসজিদে আদায় করে তিহান।যেন নতুন এক ভালোলাগার জগতে প্রবেশ করেছে সে। বাসা হারিয়ে ফেলা কোনো পাখি যেন তার বাসা খুঁজে পেয়েছে।


নামাজ শেষ করে বের হতেই নজর পড়ল তার পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সেদিনের সেই পিচ্চি। এরমধ্যে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয় তিহানের সাথে ।ওর নাম আল-আমিন। তিহানের সাথেও ওর সখ্যতা ও হয়েছে বেশ। তিহান তাকে ইশারায় এক পাশে দাড়াতে বলল।
 তিহান বলে উঠলঃ- আল আমিন আমরা কেন রোজা রাখি জানো?

__ জ্বি ভাইয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। 

__ আসলেই আমরা তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য রোজা রাখি। চলো তুমি আজ আমাদের সাথে ইফতার করবে।

কিছুক্ষণ ভেবে মুচকি হেসে  আল-আমিন বলে উঠল
__ জি ভাইয়া চলেন।

দু'জন হেঁটে যাচ্ছে তিহানের বাড়ির দিকে। মাঝে মধ্য কিছু কথায় তারা দুজনই হেসে উঠছে। আজকেও সেই ছোলেটি  ইফতার করবে একসাথে, তবে সেদিনের ঘোর আধারে হারিয়ে যাওয়া তিহানের সাথে নয়।আজ ইফতার করবে ঘন আঁধার  রাতে জোনাকির আলোর পিছু নিয়ে জ্যোৎস্না খুঁজে পাওয়া তিহানের সাথে।


ইসলামি গল্পের কথামালা


Powered by Blogger.