বৃষ্টির রাত

 বৃষ্টির রাত

মোঃ আশিক মোস্তফা



রাত বারোটা। কিছু সময় পর পর জানালা দিয়ে শীতল বাতাস প্রবেশের শন শন আওয়াজ ছাড়া দূর থেকে ভেসে আসা কোনো শব্দও কানে আসছে না। মাঝরাতে ডাকা কুকুররাও বোধহয় আজ বিশ্রামে গেছে। অন্যদিনের রাত বারোটার সাথে আজকের রাত বারোটার পার্থক্য বেশ স্পষ্ট। বৃষ্টি ভেজা রাত একটু বেশিই নীরব। শুধু নীরববই না, কাটিয়ে দেয় একরাশ ক্লান্তি। মুছিয়ে দেয় আভা, জাগিয়ে দেয় স্মৃতি, ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির পাতায়।


সাদ, রাজন, তাসিম যে যার বেডে কাঁথা মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি টেবিলে বসে কালকের কিছু এসাইনমেন্ট এর কাজ করছিলাম। তবে গত আধ ঘন্টা হলো আমি কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারছি না। ঘুম আসছে সেটাও মনে হচ্ছে না। আয়নাতে নিজের মুখখানি দেখে চোখের পাতায় ক্লান্তির কোন ছাপও পেলাম না। জানালার বাইরে হাত বাড়ালাম। নাহ, বৃষ্টি নেই। তবে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন।
কোনো কিছু না ভেবেই বাইরে বেরিয়ে পড়লাম। লক্ষ্য কোথায় তা এখনও জানি না। হাঁটছি তবে তা কেবল একান্তই মনের খোরাকে। স্মৃতির পাতায় যেন গভীর মনোযোগে অনুসন্ধান করে বৃষ্টি ভেজা রাত। জাগিয়ে দেয় হারিয়ে ফেলা কোন স্বপ্ন, না পাওয়া কোন আকাঙ্ক্ষা, অবেলার অপূর্ণ কোন চাওয়া পাওয়া। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে রিয়াদ মামার চায়ের দোকানের সামনে চলে এসেছি সে খেয়াল নাই। চায়ের দোকান বন্ধ। সামনে একটু হেটে দোকানের পাটাতনে বসলাম। হঠাৎ কারও ভাঙ্গা কন্ঠের আওয়াজে পিছে ফিরলাম।
মামা.. রাতে এখানে কি করো?

রমিজ পাগল, সবাইকে ও মামা বলেই ডাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে তাকে এই চৌরাস্তায় দেখি সবসময়। কারো সাথে খুব একটা কথা বলে না। সারাদিন দুই হাত দিয়ে মাটিতে ঘর আঁকে আর মাটির ভিতর থেকে ছোট ছোট ঝিল নিয়ে নিজের থলির ভিতরে রাখে। আস্তে আস্তে হেঁটে পাটাতনের সামনে এসে রমিজ পাগল আমার পাশে এসে বসল। কিছুটা ভয় পেলেও নিজেকে সামলে নিলাম।

এরমধ্যে মনে পড়লো গত সপ্তাহের কথা।গত রবিবার তাসিম চায়ের দোকানে চা খেয়ে খুব দ্রুত ফিরছিলো। প্রচন্ড ব্যস্ততায় ক্যাম্পাসে ফেরার সময় রাস্তার পাশে আঁকা রমিজ পাগলের ঘর ওর পায়ের নিচে পড়ে মুছে যায়। রমিজ পাগল তার পাশেই বসা ছিল। তার আঁকা ঘর মুছে যাওয়ায় দৌড়ে গিয়ে তাসিমের হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। যার জন্য তাসিমকে গত এক সপ্তাহ যাবৎ ওষুধ খেতে হচ্ছে।ঐ ঘটনা মনে পড়তেই আমার বুকে ধুক-ধুক করা শুরু হয়ে গেছে। পাটাতন থেকে এখনই উঠে যাব ভাবতেই এমন সময় রমিজ পাগল আমার কাঁধে হাত দিল। আমি তার দিকে তাকালাম, তার চোখে নেই কোন হিংস্রতা, নেই দিনের বেলায় মাটিতে নতুন ঘর আঁকার ব্যস্ততা, যা আছে তা কেবল অসহায়ত্ব ও আকুলতা।
কাঁধে হাত রেখেই আমার দিকে ফিরে থলি থেকে একটা কাগজ আস্তে আস্তে বের করলো। কাগজটা আমার দিকে এমন ভাবে ধরছে যেন সেও আমার সাথে দেখতে পারে। কাগজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে ছয়জনের ছবি দেখা যাচ্ছে, ভালোভাবে দেখলাম। তার মধ্যে একজন রমিজ পাগল নিজেই, তার পাশে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে, মুখের বয়সে মনে হচ্ছে তিনি রমিজ পাগলের স্ত্রী। দুইটা ছোট ছোট বাচ্চাকেও দেখা যাচ্ছে। পোশাকে মনে হল দুইটাই মেয়ে। একটি মেয়ে রমিজ পাগলের কোলে অন্যটি তার পাশে দাড়িয়ে থাকা মহিলাটির কোলে। তাদের দুজনের পিছনে দাড়িয়ে আছে বেশ বয়স্ক একজন বৃদ্ধ ও একজন বৃদ্ধা যাদের মুখে উপচে পড়া মুচকি হাসি। বুঝতে বাকি রইল না এটা তার পরিবারের ছবি। সহজেই অনুমান করলাম পিছনের মানুষ দুইজন রমিজ পাগলের মা ও বাবা। আমি নীরবতা ভেঙে তার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। রমিজ পাগলের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
এটা আপনার পরিবারের ছবি? আমি জিজ্ঞেস করলাম। সে মাথা নাড়ল।
আমি উৎসুক হয়ে জানতে চাইলাম, ওনারা কোথায় এখন ??
সে আমার কথার কোন উত্তর দিল না। ছবির মানুষগুলোর মুখে হাত বুলাচ্ছে, সাথে তার চোখের পানি মুখ ছাড়িয়ে নিচের মাটিতে পড়ছে। আমি অপলক তার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। কতক্ষণ হয়ে গেছে তা বলতে পারব না। হঠাৎ হাত ঘড়িটার দিকে নজর গেল, রাত আড়াই টা বাজে। রমিজ পাগল তখনও কাঁদছে। তার চোখের পানি যেন অবাধ্য ফোয়ারা আজ, কোনো বাধাই মানছে না।
বৃষ্টি ভেজা রাত শুধু পুরনো স্মৃতি জাগিয়ে দেয় না, স্মরণ করে দেয় সোডিয়াম আলোয় ভরা এই শহরের আশ্রয়হীন মানবের গোধূলি বেলার গল্প। পাটাতন থেকে উঠে ক্যাম্পাসের দিকে চলেছি। বেশ দূরে চলে এসেছি, মিনিট পাঁচেকের পথ তো হবেই, মনের গভীরের অসীম আগ্রহে পেছনে তাকালাম। স্পষ্টত পাটাতনে বসা রমিজ পাগলের চোখের পানি তখনও নীরব রাতের সাথে নীরবতার সাথে ঝড়ে যাচ্ছে।


Powered by Blogger.