শীত সকালের পদচারণ
মোঃ আশিক মোস্তফা
শীতকালীন ঝুম বৃষ্টি। শব্দটায় যেখানে বড্ড বেমানান, সেখানে শব্দটাকে সঙ্গায়িত করে লেখা নেহায়েতই বোকামি। তারচেয়ে বরং মায়ের হাতের পুরনো নকশিকাঁথা ও লেপের নিচে আষ্টেপৃষ্টে রেখে মায়ের হাতের খিচুরি খেয়ে দিন পার করাই শ্রেয়। যাহোক নিজের অবস্থান যখন সহস্র ফোড়ের রঙিন কাঁথার নিচে না, তখন তার কথাও বলা ঠিক না। গত সন্ধ্যা রাতেই মেঘেতে ঢেকে গেছে চাঁদ। বাকি রাত জুড়ে আর দেয় নি দেখা পাটাতনের ছিদ্রে নেমে। ভোর রাত, মানে বেশ রাতই বলা যায়। সবে ফজরের আজান ভাসছে দূর মিনারে। বিসমিকার ডাকেই ঘুম ভাঙল। এটাকে ঠিক ডাক বলে না। যা বলে এটাকে।সেটাকেও সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া ঠিক না।
বাইরে হিম শীতল বাতাস বইছে। দীর্ঘ সময় বর্ষার পর যে বিরতি চলছে তা বাতাসের গন্ধই জানান দিচ্ছে।
__ আজকের বাতাসের ঘ্রাণটাই কত সুন্দর দেখছো।
__ ওতো বাতাস দেখতে হবে না আপনার। ওযু শেষ করে তাড়াতাড়ি রুমে যেয়ে শীতের কাপড় গায়ে জড়ান।
যাহ, আবহাওয়ার সাথে যে মুড টা তৈরি হয়েছিল, তা এক নিমিষেই দিলো উড়িয়ে।
__ আর হ্যাঁ, নামাজ শেষে আজ মোটেও একা হাঁটতে যাবেন না। আজকের পরিবেশটা অনেক সুন্দর। নামাজ শেষে আগে বাসায় আসবেন। তারপর আমিও যাব আপনার সাথে হাঁটতে।
__ এই ঠান্ডায় বের হওয়া ঠিক না। ঠান্ডা লাগবে তোমার।
__ জ্বি আপনিও নামাজ শেষে সোজা বাসায় আসবেন। আপনারও ঠান্ডা লাগবে নাহলে।
সূত্রের ডানপাশে পড়ছি।যেই যুক্তিই বানাব,তা যে আমার উপর দিয়েই প্রয়োগ হবে তা ভাল ভাবেই আচ করতে পেরেছি।
__ আচ্ছা নামাজ শেষ করে গুছিয়ে থাকো তুমি। আমি মসজিদ থেকে এসেই নিয়ে যাব তোমাকে।
টার্ম ব্রেকের ছুটিতে বাসায় এসেছি গত দিন তিনেক আগে। আগামী পরশু ফিরতে হবে ক্যাম্পাসে। বিসমিকারও টার্ম ব্রেক চলছে। সেই জন্যই একসাথে আসা বাড়িতে।
হাঁটছি তো হাঁটছি, গ্রামের রাস্তা ফুরিয়েছে অনেক আগেই। এখন মাঠেই রাস্তায় চলেছি। হোক না শত ভোর বা আবহাওয়া বৈরী, কৃষকেরা চলে এসেছে মাঠে,তাদের দিন কাটানো প্রাণের ক্ষেতে।
ফসল, মাঠ আর চোখের সামনে যা আসছে তা নিয়ে বিসমিকার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। সব প্রশ্নের উত্তর যে আমি সঠিক দিচ্ছি, মোটেও তা নয়, কিন্তু আমার এমন বিশ্লেষণধর্মী উত্তরে বিসমিকা যে পূর্ণ তৃপ্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই আমার। মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম নিজেকে,যাক তাহলে আন্দাজে উল্টা পাল্টা উত্তর বলার অভিজ্ঞতা আজকে বউয়ের মন যোগানোই মহা কাজে লাগলো।
__ আচ্ছা দেখেন না! ঐ যে ঐ পাশে মনে হচ্ছে কে যেনো শুয়ে আছে। চলেন তো দেখে আসি।
দূর থেকে বুঝলাম হয়তো ওপার থেকে কোনো পাগল ঢুকেছে রাতে। ছোট থেকেই দেখে আসছি সীমানা পেরিয়ে কত কত পাগল আসতো আমাদের গ্রামে। কয়দিন বাড়িতে-বাড়িতে, রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরতো। আমরা পিছে পিছে ছুটতাম। আর পাগল পাগল বলে ক্ষেপাতাম। কখনও ওরা উল্টো তাড়া করত তো আমাদের, কখনও নিজেরাই দৌড়ায়ে পালাত। কয়দিন পর আর দেখা মিলত না ঐসব পাগলদের।
__ হয়তো কোনো পাগল হবে,ঐপার থেকে আসছে। বরং চলো আমরা ঐ বিলের ধারের বালুর রাস্তাটার দিকে যায়।
__ কি বলেন পাগল আসে নাকি ওপার থেকে আবার। (একটু চমকে উঠে)
__ হ্যাঁ পাগল। (আমি মুখটাকে বেশ ভঙ্গি করেই বললাম যাতে ও না যেতে চাই।বিসমিকা যে পাগলের প্রচন্ড ভয় পাই, তা ওর সাথে দেখা হওয়ার প্রথম দিনেই টের পেয়েছিলাম।)
একটু সরে এসে আমার ডান হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।বললো
__ চলেন এবার।এখন আর পাগলের ভয় নাই। আর আমি তো আপনার ডানপাশেই আছি।
যা ভাবলাম।হয়লো বিপরীত। যাহোক রওনা দিলাম সেদিকে। যা ভাবছি তাই ই যে হলো তা ঠিক বলা যাবে না। ধানের খড়কুটো বিছিয়ে তার উপর শুয়ে আছে। তবে একজন নয়, দুইজন। একজন মহিলা,সাথে একটা বাচ্চা।বাচ্চাটা দেখে মনে হচ্ছে বয়স খুব বেশী হলে দিন পনের হবে হয়তো। দুইজনেই কেপে উঠছে ঘুমের মাঝেই। যদিও কাঁপুনি দেওয়া শীত তাদের ঘুমের মোটেও ব্যঘাত ঘটাচ্ছে না মনে হলো। পিঠে বিছানো খড় টুকরো টাও যেখানে অনিশ্চিত সেখানে শীতের প্রকোপে হারা মানা নেহায়ত মেকিই বলা যায়। বেশ কিছুক্ষণ পর বিসমিকা হাত ছেড়ে ওর চাদর খুলে ওনার দিকে এগিয়ে গেলেন।বুঝতে বাকি রইল না কি করতে যাচ্ছে সে।
__ বিসমিকা! তোমার চাদর খোলার দরকার নেই। কেমন ঠান্ড বাতাস বইছে দেখছো। ঠান্ডা লাগবে। বরং আমার টা দিয়ে দাও।
বিসমিকা আরো একধাপ এগিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠলো।
__ কোনো দরকার নেই। ফেরার পথে আপনার চাদর তো এমনিতেই আমার গায়ে থাকবে। ঠান্ডা আপনারই লাগবে। ফেরার পথে চাদর ছাড়া যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন।
বেশ কিছুক্ষণ আগেই আমাদের কথোপকথনে মহিলাটির ঘুম ভেঙে গেছে। অবশ্য কোনো কথা তিনি বলছেন না। কিছুক্ষণ পর পর আমাদেরকে একপলক দেখেই অবিরাম চেয়ে আছেন পাশে থাকা বাচ্চাটির দিকে। তার মুখে নেই ভারসাম্যহীনতার প্রলাপন, চোখে নেই হিংস্রতার ছোঁয়া। চোখ জুড়ে যা আছে তা কেবল মাতৃত্বের মমত্ববোধ, মুখমন্ডল জুড়ে কেবলই অসহায়ত্ব।
বিসমিকা চাদরটি হাত বাড়িয়ে দিয়ে মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে বলল।
__ চাদর টা বাবুর গায়ে জড়িয়ে দিন। বাবুটা শীতে কাঁপছে অনেক।
পর পর দুই-তিনবার বলার পরেও মহিলাটি নিশ্চুপ হয়ে কেবল বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে আছে। অগ্যতা বিসমিকা যেয়ে বাচ্চাটির গায়ে চাদর জড়িয়ে দিল।
একটা বিষয় খেয়াল করলাম।বাবুটার কোমর বরাবর উড়না পেচিয়ে মহিলাটি নিজের হাতের সাথে বেঁধে রেখেছে। কি আশ্চর্য! হতে পারে তিনি ভারসাম্যহীন, হতে পারে বোবা। তাতে কি! সন্তান হারানোর শঙ্কায় যে শঙ্কিত মাতৃমন।
__ বিসমিকা, চলো এবার বাসায় যাওয়া যাক। (চাদরটা ওর গায়ে জড়িয়ে দিলাম)
__ আপনিও আসেন চাদরের নিচে। ঠান্ডা লাগবে নয়তো (বলেই জোরে হেঁসে উঠল)
__ মাথা ঠিক আছে তোমার!
হাতে হাত ধরে দুইজনে একমনেই ফিরছি। পাখির কিচিরমিচির ডাক ছাড়া সব চুপচাপ। কারো মুখে কোনো কথা নেই।বালির রাস্তা পেরিয়ে মাঠের রাস্তায় এসে গেছি। হঠাৎ বলে উঠলাম।
__ বিসমিকা, তুমি কি জান? তুমি কত সুন্দরী?
__ উহু আমি মোটেও সুন্দরী না।আপনি কি দেখছেন আপনার জোড়া ভ্রু ওয়ালা চোখ জোড়া কত সুন্দর (বেশ লজ্জামিশ্রিত ভঙ্গিতেই জবাব দিল বিসমিকা)
__ ঠিকই বলছো তুমি। আমার চোখ জোড়া সুন্দর বলেই তোমাকে সুন্দর দেখি। অন্যথা বোধহয় এত সুন্দর হতে না তুমি।
এক ঝটকায় আমার হাত থেকে ওর হাত ছাড়ায়ে বলল
__ কি বললেন! আমি সুন্দর না!(ততক্ষণে তার লজ্জামিশ্রিত চাহনি হারিয়ে অগ্নিমূর্ত ধারণ করেছে। হাত ছাড়িয়ে সামনের দিকে বেশ জোর কদমে হাঁটা শুরু করছে সে )
আসলেই তো কি বলে ফেললাম।
কি জানি! কি বলে ফেললাম। যাহোক সে হিসাব পরে হবে। এখন দৌড়ে হেঁটে অসমাপ্ত কাজের সমীকরণ তো মেলানো লাগবে।
"পাগলের ডায়রী"" উপন্যাসটির একটা প্লট ছিল উপরের লেখাটি।
উপন্যাসটি লেখা এখনও শেষ হয়নি। উপন্যাসটি লেখা চলমান। জানি না শেষ করব কিনা🙃। তবে শেষ না করার সম্ভাবনা ৯৯ভাগ।

