[১]
২৫শে রমজান। আগামী ২৭শে রমজান থেকে ঈদের ছুটি শুরু হবে তিহান সাহেবের। অফিসের শেষ মুহুর্তে বেশ ব্যস্ততার মধ্যে দিয়ে সময় পার করছেন তিনি। গতমাসেই প্রমোশন হয়েছে তার। সে হিসেবে বর্তমান অফিসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তিনিই। হঠাৎ ফোনের আওয়াজে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়ল। মায়ের ফোন এসেছে।
__ ভালো আছিস বাপ! খায়ছিস সকালে! বাড়ি আসপি কবে! ঈদ তো চলে আসল বলে! তুই গাড়িতে উঠবি কবে!
কথা থামিয়ে দিয়ে বিরক্ত কন্ঠে তিহান সাহেব বলে উঠল
__ এতো প্রশ্ন করলে উত্তর দিব কোনটার বলোতো। বাসায় যাব না এবার। মানহার বাবার বাসায় যাব আমরা ঈদ করতে।
__ তুই তাহলে বৌমারে বলিস, ময়নাদেরকে নিয়ে ঈদের পরদিন আসতি। আমি বড় মোরগ রেখে দিছি তোরা আসবি তাই।
__ গত ঈদেই তো গেছিলাম ঈদের পরদিন। এবার যেতে পারব না। আচ্ছা রাখ মা। আমি ব্যস্ত আছি।
__ আচ্ছা শোন বাপ আরেকটা কথা! বলছিলাম যে মনি বলছিল ওর এই ঈদে জামা লাগবে, যদি তুই টাকা পাঠাতিস জামা কেনার জন্যি।
__ গত ঈদেই তো দিলাম। এবার ঈদে না হয় তোমার অন্য ছেলেকে বলো।
__ আচ্ছা ঠিক আছে বাপ।
ততক্ষণে অবশ্য ফোন কেটে গেছে অপর পাশ থেকে।
কথা শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাহেলা বানু। মেয়েটা জামা চাইছিল এই ঈদে। কিন্তু ছোট ছেলে দিতে পারবে না। অবশ্য বড় ছেলেকেও বলেছেন গতকাল রাতে কিন্তু বড় ছেলের আর্থিক যে অবস্থা তাতে তার নিজেরই সংসার চলে না।
তিহানের বয়স তখন সাড়ে পাঁচ আর মেয়ে তখন কেবল কোলে, তখনই স্বামী হারান রাহেলা বানু্। সেই থেকে শুরু হলো সংগ্রামী জীবন তাদের। বর্তমানে বড় ছেলে কাচামালের ব্যবসা করে আর ছোট ছেলে বড় কোম্পানিতে চাকরি করে।
[২]
ঈদের ছুটিতে ঈদের পর পরিবারসহ কক্সবাজার ঘুরতে এসেছেন তিহান সাহেব। বীচে এসে সকালের সকালে হাঁটাহাঁটি করছেন তারা। হঠাৎ মনে হল আজ ৮ই মে। বিশ্ব মা দিবস। তাড়াতাড়ি ফোন টা পকেট থেকে বের করে ফোনের পুরনো গ্যালারি থেকে মায়ের একটা ছবি আপলোড করে ক্যাপশনে মা নিয়ে কাব্যময় ছন্দে বেশ কিছু লিখে পোস্ট করলেন তিহান সাহেব।
একটু বাদেই ফোনের রিংটন বেজে উঠল। ছোট বোন ফোন করেছে।
__ হ্যালো ভাইয়া কেমন আছিস?
__ ভাল, বল কি হয়ছে?
__ ভাইয়া গতকাল রাতে আম্মু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছে। বড় ভাইয়া রাতেই উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে এনেছে আম্মুরে । গত কাল রাত থেকে তোরে ফোন দিচ্ছি কিন্তু তুই ফোন ধরছিস না। এই নে আম্মু কথা বলবে তোর সাথে।
ছেলের সাথে কথা বলবে ভেবেই যেন অর্ধেক সুস্থ হয়ে যান রাহেলা বানু।
__ হ্যালো! বাপ ভাল আছিস তুই! তুই বৌমারে নিয়ে আয় একটু, তোদের কত দিন হলো দেখি না।
__ এখন যাওয়া হবে না। আমরা কক্সবাজার ঘুরতে আসছি সবাই। আমি টাকা পাঠায় দিচ্ছি তোমার চিকিৎসার জন্য।
__ আচ্ছা তাহলে তুই কুরবানীর ঈদে আয়, আমি কিন্তু মোরগটা তুই আসলেই জবাই দিব।
__ পরে কথা হবে মা, রাখ এখন।
আর বাপ শোন তুই...
নাহ আর শোনা হলো না। তার আগের ফোনের আলো জ্বলে উঠেছে।
থাক না। আর কত কথা! এ স্বার্থহীন মধুর আলাপন যে কেবলই বিরক্ত মাখা তিহানের কাছে। বুকে সহস্র জমানো গল্প রাহেলা বানুর। ছেলেকে যে আর ঘুম পাড়ানো লাগে না বুকের মধ্যে রেখে।, দেখানো লাগে না টালির ছিদ্র দিয়ে উঁকি দেওয়া চাঁদ মামাকে। বলা লাগে না গল্পের ফুলঝুড়ি। তবে গল্প জমবেই বা না কেন? থাক না জমানো। বাকি গল্প না হয় ঐ তীরেতেই শুনবে সবাই।
যে বিষয়টা বলতে চাচ্ছিঃ- গল্পটাতে বর্তমান সমাজের বাস্তব রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আসুন লোক দেখানো, সোসাল মিডিয়াময় ভালবাসা না দেখিয়ে যাদের অজস্র ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা এই ধরনীতে এত সুন্দর ভাবে আছি, তাদেরকে শ্রদ্ধা-সম্মান করি,ভালবাসি এবং প্রাণভরে দোয়া করি।
আল্লাহুম্মা রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান নার। অর্থ : হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন। এবং আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।


