অবেলার গল্পগুলো

[১]

রাত নয়টা;

কাজ শেষে বাসার দিকে ফিরছি। কনকনে শীত হওয়ায় যে যার কাজ মিটিয়ে ঘরের পানে ছুটছে। চার রাস্তার মোড় পার হতেই চোখ গেল সবুর চাচার দিকে। তিনি তখনও বসে আছে তার পাপড় আর কাঠি ভাজা নিয়ে। 


গত মাস তিনেক হলো এই এলাকাতে এসেছি। প্রতিদিন রাতে ফেরার পথে দেখি চার রাস্তার মোড়ে ষাটোর্ধ্ব একজন বৃদ্ধ বসে থাকে কিছু পাপড়,আর কাঠি ভাজা নিয়ে। বাসায় যাওয়ার পথে প্রায়শ  বিসমিকার জন্য পাপড় কিনে নিয়ে যায় এখান থেকে। লোকটাকে দেখে বেশ কৌতূহল লাগতো আমার কাছে। তিনি ফতুয়া আর লুঙি পড়তেন। কিন্তু সেই লুঙি আর ফতুয়া দেখতে আর আট-দশ জন ফুটপাতের বিক্রেতার মত লাগত না। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকত তার পোশাক। হঠাৎ একদিনই জানতেই চাইলাম চাচা আপনার বাসা কোথায়? কে কে আছে বাসায়?
সেদিন সে কোনো কথার উত্তর আমাকে দেয় নি। উপেক্ষা করে গেছিল আমার প্রশ্ন। সেসব ছিল প্রথম দিকের কথা। তারপরে প্রায় প্রতিদিন দেখা হতে হতে তার সাথে। ভাব জমে যায়। তবে তার নাম ছাড়া তার সম্পর্কে এর  বেশী কিছু জানতে পারি নাই । 

[২]

প্রতিদিনের ন্যায় আজও ফিরতি পথে সবুর চাচার দোকানে নজর গেল। আজ একটু অবাক হলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে। সবুর চাচাকে কোনোদিন এত রাত পযন্ত থাকতে দেখিনি। বেশ কিছু ফুল রয়েছে তার অস্থায়ী দোকানে। কথা বলে যা বুঝলাম তা হল,  পাশের দোকান থেকে নেওয়া ফুল সব বিক্রি না হওয়ায় বাসায় যেতে পারছেন না। আর ফুল গুলোর যে অবস্থা,আজ বিক্রি না হইলে নষ্ট হয়ে যাবে। হঠাৎ মনে হলো আমার আম্মু আব্বুও আজ বিকালে তিনদিন সফর শেষে বাসায় ফিরেছে। ফুল দিয়ে স্বাগতম জানালে মন্দ হয় না। ফুল গুলো সব নিয়ে ফিরছি এমন সময় পেছন থেকে....
__বাবা, ফুলগুলো কি আপনি আপনার বাবার জন্য নিলেন?  শুনেছি আজ নাকি বাবা দিবস।( কথাটা বলার সময় তার গলাটা ধরে এসেছে)
__ জ্বি  চাচা। তবে শুধু আব্বু না , আম্মু আব্বু দুজনের জন্যই।
__ মা শা আল্লাহ বাপজান, আরো বড় হোন।(ততক্ষণে তার চোখ থেকে পানি বেয়ে মুখের দুপাশে চলে আসছে)
__ আমি তার দুহাত ধরে, আচ্ছা আপনার বাড়িতে কে কে আছেন চাচা?

তিনি তার জীবনের ছোট গল্প শোনালেন। তিনি প্রাইভেট এক কোম্পানিতে চাকরী করতেন। তা দিয়ে তিনি তার তিন ছেলেকে বড় করেছেন। বড় ও মেজো ছেলে দুইজনেই  বেশ বড় চাকরি করে। আর ছোট ছেলে পরিবারসহ বাইরে থাকে। কিন্তু বাবা মায়ের বোঝা নিতে কেউ রাজি না। খরচ দিতেও কেউ রাজি না। তাই তিনি ও তার স্ত্রীর জীবিকা নির্বাহের জন্য এই কাজ করেন। স্ত্রী পাপড় আর কাঠি ভাজা বাসায় ভেজে দেন। আর তিনি তা নিয়ে এসে বিক্রি করেন।
ততক্ষণে আমার চোখে বেয়েও পানি পড়া শুরু হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে বিসমিকার ফোন।
__ আসসালামু আলাইকুম।
__ ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
__ আম্মু আব্বু না খেয়ে বসে আছে!  কোথায় আপনি?
__ পাঁচ মিনিট লাগবে আসতেছি।

সবুর চাচা ততক্ষণে তার জিনিসপত্র গুছিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন। রাতের এই রাস্তা গুলো বড্ড বেশিই নিস্তব্ধ। কিছুদূর পর পর সোডিয়াম বাতির আলো সেই নিস্তব্ধতায় বিদীর্ণ আভা যোগ করেছে। হয়তো এই নিস্তব্ধতাই জানান দেয় এই শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা  সবুর চাচার মত হাজারো বাবার কথাহীন শেষ গল্পগুলো।

 

কিছু কথাঃ- নাম মাত্র বাবা দিবস, মা দিবস, সো অফ না করে। যাদের অজস্র ত্যাগের বিনিময়ে এই পৃথিবীতে আগমন তাদের মনের গহীন থেকে হৃদয়ের সবটুকু আঙিনা জুড়ে ভালবাসি।

অবেলার গল্পগুলো
মোঃ আশিক মোস্তফা
১৯শে জুন,রাত ১০ঃ৪৫

 

Powered by Blogger.