হারানো ব্যাগের স্মৃতিচারণ

হারানো ব্যাগের স্মৃতিচারণ

মোঃ আশিক মোস্তফা



 __ কখন যে আসবে ট্রেন, এভাবে কতক্ষণ ওয়েট করা যায় বলতো বিসমিকা।


__ এত অধৈর্য্য হওয়ার কি আছে! এমন করতেছেন মনে হচ্ছে আজ প্রথমবারের মত শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন।
(বলেই হেসে উঠল)।



[]

সিডিউল অনুযায়ী ট্রেন ছাড়তে আর বাকি আছে ১০ মিনিট। অথচ স্টেশনে ট্রেনেরই খোঁজ নেই। অনেকদিন ধরে বললেও বিসমিকাদের বাসায় যাওয়া হয় না, তাই এবারের ছুটিতে প্রথমেই বিসমিকাদের বাসায় যাইতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে সে ব্যাগ গোছাচ্ছে। ব্যাগের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আমরা হয়ত স্থায়ী ভাবে এই শহর পরিবর্তন করতেছি। যাহোক প্রতিবাদ আর করব কেমনে। প্রতিবাদের ভাষায় যখন তার চোখের দিকে তাকালে নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন সে ভাষায় ই তো হারিয়ে যায় তার উৎপত্তি সহ। অগ্যতা ব্যাগ সমেত তাকে নিয়ে প্লাটফর্মে বসে আছি।

__ কখন যে আসবে ট্রেন, এভাবে কতক্ষণ ওয়েট করা যায় বলতো বিসমিকা।

__ এত অধৈর্য্য হওয়ার কি আছে! এমন করতেছেন মনে হচ্ছে আজ প্রথমবারের মত শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন (বলেই হেসে উঠল)।



[২]

নির্দিষ্ট সময়ের থেকে আধঘন্টা পর বেশ দূর থেকে ট্রেনের মাথা দেখা যাচ্ছে। ট্রেন স্টেশনে প্রচুর হৈ-হুল্লোড় বেঁধে গেল। যে যার ব্যাগ নিয়ে ব্যস্ত ও প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে ট্রেন পৌঁছানো মাত্রই স্বল্প সময়ে ট্রেনে প্রবেশ করতে পারে।

যাহোক বলা যায় ছোট্ট সংগ্রাম শেষে আমরা আমাদের সিট খুঁজে পেলাম। একেতো টিকিট পাওয়া যায় না। আর টিকিট পাওয়ার পর সিট খোঁজাও তো আরেকটা অভিযান। যাহোক সিটে বসার একটু পরেই ট্রেন ছাড়ার হুইসেল বেজে উঠল।

ট্রেনের এই শুরুর দিকটার পরিবেশ আমার বরাবরই ভাল লাগে। কোলাহলে মুখরিত স্টেশন হুট করেই পিনপতন নিরব হয়ে যায় বাঁশি দেওয়ার পরেই। ট্রেনের হুইসেল শোনার সবচেয়ে নিরব পরিবেশ বোধহয় সেটাই।
__ আমার ছোট ব্যাগে দেখেন ফ্লাক্স রয়েছে। একটু বের দেন তো। পানি খাব আমি।

__ ছোট ব্যাগ! ( ছোট ব্যাগ টার কথা উঠতেই মনে পড়ল সেটা তো সেই স্টেশনে ফেলে আসছি। আমরা ইতিমধ্যে প্রায় আরেক স্টেশনের কাছাকাছি চলে এসেছি। কি যে হবে এখন,তার প্রস্তুতি নিলাম)

__ যা! সে তো স্টেশনে রেখে আসছি বিসমিকা। ট্রেন যখন স্টেশনে আসল, তুমি ট্রেনে উঠার জন্য তোমার পার্সটা আমার কাছে দিছিলে ধরতে, আর আমি তখন ছোট ব্যাগটা প্লাটফর্মে রেখে তোমার পার্স ধরছি। (বেশ আস্তে আস্তে মন খারাপের মত করে বললাম আর কি)

__ আমি বুঝতেই পারছিলাম এমন কিছু একটা হবে। একটা ব্যাগের দখলও ঠিকঠাক রাখতে পারেন না।

__ বুঝতেই যখন পারছিলে, তাহলে আগে বলতে আমারে বিসমিকা!

__ ব্যাগ হারায় ফেলে এখন মজা নেওয়া হচ্ছে!

__ কই মজা করলাম প্রিয়🫣। চিন্তা করো না। ব্যাগে তো জরুরী তেমন কিছু নেই। যা গেছে তো গেছে ও নিয়ে আর ভেবো না।

__ সে না হয়, আজ চিন্তা করলাম না। কিন্তু আপনি মনে করেন তো এরকম ভাবে কত কিছু হারায়ছেন?

__ অনেক কিছুই হারিয়েছি কিন্তু মুল্যবান সম্পদ পেয়ে গেছি একটা। তাই হারানোর সব স্মৃতি অতল গভীরে হারায়ে গেছে।

আজ থেকে তিন বছর আগের কথা। বেশ কিছু বই সাথে নিয়ে ফিরছিলাম খুলনার দিকে। ঐ ট্রেনে বিসমিকাও ওর আম্মু আব্বুর সাথে খুলনাতে ওদের কোনো এক রিলেটিভের বাসায় বেড়াতে যাচ্ছিল। তাড়াহুড়ো করে ট্রেনে উঠার সময় আমি প্লাটফর্মে বইগুলো ফেলে রেখেই উঠে পড়ি। স্টেশনে বিসমিকারা আমার পাশেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল যেটা পরে শুনছি ওর আব্বুর কাছে। ট্রেন ছাড়তে তখন আর মিনিট খানেক বাকি। তিনি দেখলেন আমি যেই ট্রেনে উঠছি তাদের গন্তব্যের পথও সেই ট্রেনে। তো আর কি! তিনি বইগুলো সাথে নিয়েই ট্রেনে উঠে পড়লেন। যাতে আমাকে ফেরত দেওয়ার একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়। আমার সব বইয়ের একটা বৈশিষ্ট্য হইলো, আমি বইয়ের শুরুর পাতায় আমার পূর্ণ ঠিকানা লিখে রাখি। তো ট্রেনের উঠার একটু পরেই আংকেল ফোন করে জানাল আমার বই তাদের কাছে আছে। যেহেতু দেখছে আমি এই ট্রেনেই উঠছি তাই ট্রেন দ্রুত ছেড়ে দেওয়ায় তারা বই সাথে নিয়েই উঠে পড়ছে। তিনি জানালেন তারা 'ঞ' নং বগিতে আছে। তারা খুলনা নামবেন, আমি যেন এর মধ্যে তাদের বগিতে যেয়ে বইগুলো নিয়ে আসি।

আমি বললাম আমি তো 'ক' নং বগিতে। বই আনতে গেলে বেশ বড় পথ পোহাতে হবে। তারচেয়ে বরং আমিও যেহেতু খুলনাতে নামবো, তাহলে স্টেশনে নামার পরেই নিয়ে নিব।যাহোক সেদিন স্টেশন থেকে নেমেও বই নেওয়া হয়নি, কারণ আমি হঠাৎ করে জরুরী প্রয়োজনে তাদের না জানিয়ে খুলনার বেশ আগে নেমে গেছিলাম। পরে খুলনায় তাদের রিলেটিভের বাসার ঠিকানা নিয়ে সেখান থেকে বই নিয়ে আসছিলাম। আর আসার সময় আংকেলকে কয়েকটা বইও গিফট করে আসছিলাম। সেই সুবাদে বিসমিকার সাথে পরিচয় হয়। তারপরের কাহিনী বেশ সংক্ষিপ্ত। মাস তিনেকের ভিতরেই দুই পরিবারের সম্মতিতে নতুন জীবনে আবদ্ধ হয় আমরা।

__ এই যে কই হারালেন! (বিসমিকার কথায় হুশ ফিরল।)

মুচকি হেসে বললাম
__ বইগুলো না হারালে কি আর আমার এই প্রিয়শীকে পাওয়া হত!
এই জন্য সব হারানো আসল হারানো না, বরং তা বড় কিছু অর্জনের প্রস্তুতি পর্বও বটে।

__ কত সুন্দর হাওয়া দেওয়া হচ্ছে আমারে! (বেশ লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠল)

__দেখা যাক এবার ব্যাগ হারানো দিয়ে কি হয় আবার আমার। (বলেই জোর শব্দে হেঁসে উঠলাম)

__ ইস! আইসে! শখ কতো। ব্যাগের কোথাও কোনো জিনিসে ফোন নং তো অনেক দূরে কথা। সিংগেল ডিজিট নাই।

__ তাহলে তো আর কোনো প্রস্তুতি পর্ব হইল না(মজা করেই বললাম

ভেংচি দিয়ে বলে উঠল
__ আহা! প্রস্তুতি পর্ব হইল না।

ট্রেন চলছে দূরন্ত গতিতে। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। চাঁদ টাও একটু পর পর উঁকি দিচ্ছে জানালা দিয়ে। পুরনো কত স্মতি মনের কোটরে জানান দিচ্ছে। বিসমিকার দিকে তাকালাম। বাদামের খোসা ছাড়িয়ে আমি তার হাতে দিচ্ছে একটু পর পর। আর সে নিশ্চিন্ত মনে কাঁধের উপর মাথা রেখে জানালা দিয়ে চাঁদের লুকোচুরি খেলা দেখছে...........

অসমাপ্ত........

হারানো ব্যাগের স্মৃতিচারণ
মোঃ আশিক মোস্তফা
১৮.১২.২০২৪




Powered by Blogger.