__ বাইরে দেখো কত সুন্দর চাঁদ উঠছে, বিসমিকা!
বাইরে তাকালো বিসমিকা, তবে কথা বলল না। আমি বললাম
__ বাইরের চাঁদটা তোমার থেকে সুন্দর হতো, কিন্তু চাঁদ তারপরও কেন পিছিয়ে আছো জানো কি!
__ কিন্তু কেন ? (বেশ গম্ভীরমুখে, তবে উৎসুক হয়েই জানতে চাইল বিসমিকা)
[১]
ওর সাথে মজা নেওয়ার জন্য বললাম।
__কি হইল তোমার? ব্যাগ গোছাও কেন। আমার যতদূর মনে পড়ে আমি তো গত এক দুইদিনের ভিতর তোমার সাথে কোনো ঝগড়াঝাটি করিনি।
__ হ্যাঁ, হ্যাঁ করছেনই তো। টানা অফিস করতেছেন৷ বাসায় যে একটা মানুষ আছে সে খেয়ালই নেই। ঠিকঠাক খেয়াল না রাখা কি ঝগড়াঝাটি করার চেয়ে বড় অপরাধ না! তাই শ্বশুরবাড়ি চলে যাব আজই(বলে হেসে উঠল সে)
__ এখন ওত গুছিয়ে লাভ নেই বিসমিকা। আমি তো টিকিট কাটতেই ভুলে গেছি।
ও একবার আমার মুখের দিকে তাকালো, তারপর আবার তার গোছানোর কাজে মনোযোগ দিল। তারপর বলল
__ তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নেন। ন'টায় ট্রেন। আমরা ইফতারের পর পরই বের হবো। আর হ্যাঁ, টিকিট আমি কেটে রেখেছি।
__ তুমি কাটলে কেন? যদি আমি কাটতাম! তখন তো ডাবল হয়ে যেতো।
__ ইস! আইছে! ডাবল হয়ে যেতো। আপনার দ্বারা এখন পযন্ত হয়ছে এমন কাজ! যা আমারে মনে করায় দেওয়া লাগেনি!
__ তোমার চোখের দিকে তাকালে নিজেরেই তো ভুলে যায় বিসমিকা। আর টিকিট কাটার কথা কেমনে মনে রাখি বলো প্রিয়!
__ হইছে! হাওয়া না দিয়ে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আসেন। ইফতারের বেশী দেরি নেই আর।
বিসমিকার সাথে আমার এটাই প্রথম ঈদ। মাস তিনেক হলো আমাদের বিয়ের।। সে এজন্য এই ঈদটা আমাদের দুজনের জন্যই অতিরিক্ত স্পেশালই আর কি।
[২]
ট্রেন ছাড়ছে বেশ কিছুক্ষণ হইল। রমজান মাস হওয়ায় ট্রেনের প্রায় সবাই মনে হয় ঘুমিয়ে পড়ছে। আমি ঘুম না আসাতে সাইমুম সিরিজের একটা বই নিয়ে পাতা এপিঠ ওপিঠ করে বিরতিতে রাখা বুকমার্ক টা খুঁজতেছি। কেবিনের জানালা টা হালকা উঁচু করে দিলাম, সেখান থেকে ঝিরিঝিরি বাতাস আসতেছে। বিসমিকা ফোনে কথা বলতেছে বাসায়। তার কথা বলা শেষে..
__ কি সব বই নিয়ে বসলেন এখন। রাখেন ওসব। ঘুমান তো, সেহরী সময় হয়ে যাবেনে আবার।
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বইটা হাত থেকে টেনে নিয়ে ল্যাগেজে রেখে দিল। আমি কেবল তার দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম।
[৩]
বিসমিকা আমাকে একনাগাড়ে তার বিরামহীন গল্প শোনাতে ব্যস্ত, যেন গত ২০/২১ বছরে তার জমানো গল্প, আগামী কয়েক যুগেও শেষ হবে না। তার শৈশব, তার কৈশোর, তার পরিবারের গল্প আর আমি তার একনিষ্ঠ শ্রোতা হয়ে এক পলকে চেয়ে আছি।
__ এই যে! আমি গল্প বলতেছি শোনার জন্য! এভাবে পলকহীন চেয়ে থাকার জন্য নয়।
__ গল্পের চেয়ে যখন গল্পকারই অনন্য সুন্দর, তখন গল্পকারকে দেখা ছাড়া কি আর গল্পে শুনতে মন বসে!
__ চলে আইসে,সাহিত্যিক! চলেন সেহেরি করে নিই, সময় হয়ে গেছে।
__ বলো কি! তুমিই তো বই নিয়ে নিলে যে সেহরির সময় হয়ে যাবে এখন তাড়াতাড়ি ঘুমান। এখন তোমার গল্পেই সেহরি!
[৪]
ছাত্রজীবনে ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ার সময়ে একটা পোস্ট শেয়ার করতাম "ছুটির বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশী"। এখন সেই চাঞ্চল্যময় ছাত্রজীবন আর নেই। তবে পেশাজীবনের ছুটির সময়কেও আজও অতি ক্ষণস্থায়ীর খাতায়ই সঙ্গায়িত করতে হচ্ছে। ছুটি শেষ। কাজের স্থলে ফিরতে হবে। মিনিট পাঁচেক হলো ট্রেন ছাড়ছে। সারাটা দিন প্রচন্ড বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়াও বেশ ঠান্ডা। ল্যাগেজগুলো ঠিক ঠাক গুছিয়ে রেখে বিসমিকার পাশে যেয়ে বসলাম। তার মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে তারও মন খারাপ হয়ে আছে ছুটি শেষ হওয়ায়। বিসমিকা সেই বাসা থেকে রওনা দেওয়ার পর থেকেই নিশ্চুপ হয়ে আছে। অগ্যতা আমিই আগে শুরু করলাম
__ এই যে আমার বিরামহীন বিসমিকা! কয়দিনের বিরতিতে আছেন আপনি? সেই বাসা থেকেই চুপ হয়ে আছেন যে(বলে হেসে উঠলাম)
বিরামহীন বিসমিকা বললে বরাবরই চেতে যায় বিসমিকা। এবারও তাই হলো। তার নিশ্চুপ অবস্থা ভেঙে বলে উঠল।
__ কি বললেন হুহ! বাসায় তো চলেন, তারপর দেখতাছি। আপাতত ট্রেনে আপনার সাথে আর কথাই নেই আমার।
চাইলাম কি আর হইল টা কি। বিসমিকার পাশে থাকা কেবিনের জানালার কপাটটা একটু উঁচু করে দিলাম। বাইরে শাওয়াল মাসের ৭দিন বয়সী আধাঁ বাটির মত চাঁদ আমাদের সাথে ছুটে চলছে। বিসমিকার দিকে তাকিয়ে বললাম
__ বাইরে দেখো কত সুন্দর চাঁদ উঠছে!
বাইরে তাকালো বিসমিকা, তবে কথা বলল না। আমি বললাম
__ বাইরের চাঁদটা তোমার থেকে সুন্দর হতো, কিন্তু কেন পিছিয়ে আছো জানো কি!
__ কিন্তু কেন ? (বেশ গম্ভীরমুখে, তবে উৎসুক হয়েই জানতে চাইল বিসমিকা)
__ তোমার বিরামহীন কথাতে যে সৌন্দর্য, সেটা তো আর চাঁদের নেই, সেদিক থেকে তোমার সৌন্দর্যের চেয়ে যে বহুগুনে পিছিয়ে আছে চাঁদ।
আমার কথার কোনো প্রতিউত্তরে না দিয়ে আমাদের দিকে চেয়ে কেবলই হাসতে লাগল সে মানবী। আর আমি কেবল নির্বাক দর্শকই। এমন দর্শকই যে হতে চায় অনন্ত সময় ধরে। এমন মুহুর্ত আমাদের জীবনে আসুক বিরামহীনতার পাতা হয়ে বিরামহীন ভাবে....
অসমাপ্ত.............
ঈদ যাত্রা
মোঃ আশিক মোস্তফা


