ঝিরি বর্ষা

 [১]

বসন্তের শুরুতেই গত তিন দিন তিন রাত ধরে থেমে থেমে ঝড়ো বৃষ্টি, যেন শুষ্ক রুক্ষতার দীর্ঘপথ শেষে প্রাণের স্পন্দন প্রকৃতিতে। যদিও বসন্তের আগমনে স্পদনের সূচনা আরও দিন কয়েক আগেই হয়েছে তারিখের হিসাবে। কিন্তু ফাগুনের তারিখের সাথে তো বসন্ত চলে আসে না। প্রকৃতি বসন্ত খুঁজে পাই কোকিলের ডাকে, ঝড়ে যাওয়া গাছগুলোতে জেগে উঠা কচি ডগাতে, চারপাশে মুকুলে ভরা গাছ গুলোতে মৌমাছির পদচারণে। যদিও মানুষের হৃদয়ে বসন্ত আসে কি, আসে না! তার হৃদয়েশ্বরী স্মৃতিই জানে, তার জীবনে এসেছি কি বসন্ত! নাকি নিতান্তই অবহেলার গাহনে দগ্ধ। তবে আর যাহোক প্রকৃতিতে বসন্তের ছোয়া লাগলে তাতেই যেন বসন্ত এসে গেছে। কার হৃদয়ে বসন্ত আসল কি আসলো না, তা খোঁজ প্রকৃতি রাখে না।




দুপুরের দিকে বৃষ্টি একটু বিরতি নিলেও শেষ বিকালে আবার শুরু হল। বসন্তের কথা ভাবতে ভাবতে অফিস শেষে বাইরে বেরিয়ে বিসমিকাকে ফোন দিলাম। তখন বৃষ্টি, তবে খুব বেশী না, ঝির ঝির যেটাকে বলে আর কি, একটু ভিজতে ইচ্ছে হলো, আবার ঠান্ডা লাগারও ভয় হল, তাই রেনকোটটা না পরে মাথায় ক্যাপ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ফোনে কথা বলার মাঝেই তারে বললাম

__ বিসমিকা! ব্যাগ গুছাও। বাসায় আসছি আমি! আমরা বের হচ্ছি সন্ধ্যা ট্রেনে!
__ এখন হুট করে করে কেন! তারপর আবার এরকম পরিবেশে! কি হয়ছে!কোনো সমস্যা হয়ছে আপনার! আপনি ঠিক আছেন তো!

[ হঠাৎ আমার কাছে এমন শুনে বিসমিকার কথায় বেশ উৎকণ্ঠার আভাস টের পেলাম। তাই উৎকণ্ঠা নিমিষ করতে বললাম..
__ আরে ভয়ের কিছু নাই। চারপাশের আবহাওয়া এই কয়দিন কত সুন্দর দেখছো না! আমি তো এত সুন্দর আবহাওয়ায় আমার পুরনো স্মৃতিতে হারায় গেছি, কাজে মন বসেও বসছে না। আগামী দুইদিন তো ছুটিও আছে, তাই ভাবলাম একটু বাসায় ঘুরে আসি, তুমি গুছায় নাও। সন্ধ্যায় ট্রেন আমাদের।

[কথাগুলো বললাম উৎকণ্ঠা কমাতে কিন্তু হিতে বিপরীত হইল]
আমার কথা শুনে বিসমিকার কণ্ঠের "উৎকণ্ঠা" পরিবর্তিত হয়ে "উচ্চ গর্জনে" পরিণত হল।
__ পুরনো স্মৃতি তাই না! আহা! কত সুন্দর করে বলেতেছে দেখো! আপনি বাসায় আসেন দ্রুত, আপনার সাধের পুরনো স্মৃতির সাথে বসে আগে ফায়সালা করে নিই। তারপরে সিদ্ধান্তঃ নিব আমরা কোথাও যাব কি যাব না!

কথাগুলো বলে ফোন কেটে দিল। যাহোক আসন্ন মুখোমুখি অবস্থার কথা চিন্তা করে যাওয়ার পথে দুইটা রক্তিম জার্বেরা ফুল ও তার পছন্দের চকলেট নিয়ে বাসার দিকে এগুতে থাকলাম। তবে তার মুড যেহেতু প্রথম কোয়াড্রেট থেকে ঘুরে চতুর্থ কোয়াড্রেট এ পৌঁছে গেছে তাই বাসায় যেয়ে কেমনে কি বলা যায় তারই সম্ভব্য ইকুয়েশন মেলাতে মেলাতে বাসার পথে এগিয়ে যাচ্ছি। যদিও বিয়ের এই সাত মাসে, আগে থেকে করা এমন শত শত ইকুয়েশন মেলা তো কথা দূরের কথা, সমীকরণে মুখোমুখি হওয়ার পর সেটা সরল সমীকরণ নাকি জটিল সমীকরণ সেটা বুঝতেই নতুন সমীকরণ চলে আসে। তাই মুখোমুখি হওয়া কোনো সমীকরণের সমাধান আজও করা হয়ে উঠেনি।


[২]

স্টেশনের উদ্দেশ্য সিএনজিতে উঠার পরেই বাইরে প্রচুর বৃষ্টি। এ যেন ভরা আষাঢ়ের দীর্ঘ বিকালের এক ঘন বরষা। কাল মেঘে ঢাকা আকাশ। সন্ধ্যা হওয়ায় আগেই যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে আজ শহরে। সাথে মৃদু দমকা হাওয়া। বাইরে থেকে প্রচন্ড বৃষ্টির আচ লাগতেছে আমাদের। স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততক্ষণে প্রায় কাকভেজা হয়ে গেছি। স্টেশনে আসার পর কাউন্টার থেকে দায়িত্বশীল বললেন ট্রেন কমপক্ষে দুই ঘন্টা লেট হবে। আসার পথে ট্রেনের কোথায় জানি সমস্যা হয়ছে। আমি বিসমিকার পাশে বসতে বসতে বললাম ট্রেনের আপডেটের কথা। বিসমিকা বলে উঠল
__ দুই ঘন্টা কেন! দশ ঘন্টা দেড়ি হলেও আমরা বের হবো। আপনার মন বসাতে হবে তো তাই না!

আমি বললাম
__ তখন তো মজা করছি আমি! (তারপর বেশ গম্ভীর ভাবেই বললাম) তোমার জন্যই তো বের হয়ছি। আজকে না বের হলে কি এই শহরের এত সুন্দর মেঘ মাখা সন্ধ্যা-বিকাল দেখতে পেতে? রেল স্টেশনের এই শুনশান পরিবেশের সৌন্দর্য দেখতে পেতে! যদি আমরা না আসতাম! (প্রচন্ড বর্ষার কারণে হাতে গোনা কিছু লোক স্টেশনে ঘুরছে)। ঐ দেখ বাইরে এই বর্ষায় কাকগুলো আশ্রয়ে না যেয়ে কেমন উপভোগ করছে। এত সুন্দর মুহুর্ত কি আমরা পেতাম বলো যদি আজকে তোমারে নিয়ে বের না হতাম!

বিসমিকা থামিয়ে দিয়ে বলল
__ ইশ! চলে আসছে আমারে বুঝাতে! আমারে কাকের ভেজা দেখাতে নিয়ে এসে তো নিজেই তো কাকভেজা হয়ছেন। এবার শুধু ঠান্ডা-সর্দি লাগুক, তারপর দেখেন কেমনে স্মৃতি জাগরণের শখ মেটানো হয়।



[৩]

ট্রেন আসলো দুই ঘন্টা নয়, সাড়ে তিন ঘন্টা লেটে। সন্ধ্যা ছয়টার ট্রেন ছাড়ল সাড়ে নয়টায়। ট্রেনেও মানুষের সংখ্যা শুধু কম নয়, নিতান্তই কম। আমাদের কামরায় হাতে গুনে হয়ত বিশ জনেক মানুষ সবমিলিয়ে। নয় ঘন্টার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। ট্রেন ছেড়ে দিল হুঁইসেল বাজিয়ে। যদিও অন্যান্য দিনের মত আজকে নেই কোনো কোলাহল, নেই ট্রেনে উঠার জন্য শেষ মুহুর্তের ছোটাছুটি। নেই স্টেশন জুড়ে হকারদের হাঁক। আছে নিস্তব্ধ স্টেশন আর কানে বাজছে শেষ প্রান্তের শান্ত মেজাজের সুরেলা হুইসেল । আর কামরা জুড়ে আমাদের মত অকারণে বের হওয়া কিছু মানুষের কানাকানি আলাপন।


[৪]

প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেল ট্রেন চলছে। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই ফোনটা একটু ঘাটাঘাটি করতেছি। হঠাৎ করেই বিসমিকা বলে উঠলো
__ আপনি কি জানেন! আপনি কত পরিবর্তন হয়ে গেছেন!
ওর এই শুনে আমি ফোন রেখে দিলাম,ভাবতে থাকলাম নিশ্চয়ই কোনো একটা ভুল হয়ছে কিন্তু কি সেটা! খুঁজতে থাকলাম! মনে না করতে পেরে বললাম!

__ কই! আমি পরিবর্তন হইলাম কিসে! তুমিই মনে হয় পরিবর্তন হয়ে গেছো, তাই তোমার এমন মনে হচ্ছে।

আগুনে বালু না হয়ে আমার কথা হয়ে গেল আগুনের তীবৃরতা বাড়ানো উদ্দীপক। মুখের আভাস তার পাল্টে গেল, বদলে গেল সুরও, বেশ ঝাঁজেই বলে উঠল
__ আমি! আমি বদলে গেছি তাই না! নিজের খেয়াল কই রেখে দিছেন!.....

বিসমিকা এক নাগাড়ে অনেক কিছু বলল, তার ঝাঁজ মেশানো মিষ্টি কন্ঠ এক কানে শুনতেছি আর মাথায় চিন্তা করতেছি ভুল আসলে কই হইলো। পরে মাথায় আসতেই ব্যাগ থেকে বাদাম নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে হাতে দিয়ে বললাম
__ এই ছোট্ট ভুলের জন্য কেউ এমন করে রাগ করে! আর সবসময় কি সবকিছু মনে থাকে বলো!

শেষ কথাটা মনে হয় আরেক দফায় রাগের তীব্রতা বৃদ্ধির এনজাইম হিসেবে কাজ করল। বিসমিকা বললো
__ ওহ আচ্ছা এটা ছোট্ট ভুল! মনে থাকে না তাই না! পুরনো স্মৃতি গুলো তো শুধু মনেই থাকে না, সাথে মাথাও এলেমেলো করে দেয়, আর সাত মাস আগে বিয়ে করা বউয়ের কথা মনে থাকে না! বাকিপথ আপনার সাথে আর কথাই নাই!

কি চাইলাম আর কি হইল। যাহোক। বেশ কিছুক্ষণ হইলো সে চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরিঝিরি। আর বৃষ্টিময় স্নিগ্ধ ঘ্রাণের যে বাতাস তা বাইরে থেকে ঢুকছে ভিতরে। আমি কয়েকবার করে ডাকার পরেও সায় দিল না বিসমিকা। অবশেষে না তাকানোর ফলে নিজেই একটু জোরে বলতে শুরু করলাম
__ বিসমিকা! বিসমিকা! জানালা দিয়ে দাও দ্রুত। বাইরের বাতাস তোমাকে ছুঁয়ে ফেলতেছে। আমার হিংসে হচ্ছে প্রচন্ড। জানালা খোলা রেখো না বিসমিকা! আর হিংসুটে বানায়ো না আমারে!

এতক্ষণ চুপ চাপ বসে মুখ ফিরিয়ে থাকলেও এবার আমার দিকে ফিরে বেশ জোরেই হেঁসে ফেললো। বললো
__ ইশ! ঢং কত! কত কি শিখে রাখছেন রাগ ভাঙাইতে! যাই করেন বাসায় যাওয়ার আগে রাগ কমাইতেছি না আজ।

তার উত্তর কি ছিল তা আমার কানে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক। তার হাঁসি আমার হৃদয়কে জানান দিয়েছে তার সবকিছুতে আমার একচ্ছত্র আধিপত্য। এমন হৃদয়গ্রাহী হাঁসির নিরব দর্শক শুধু আমি এবং আমি হতে এক অভিমান কেন! বরং এমন সহস্র অভিমানের সাক্ষী হয়ে রাগ ভাঙানোর জন্য কথার ফুলঝুরি গোছাতে সহস্র রজনী নিদ্রাহীন কাটাতেও কোনো অভিযোগ নেই আমার।

অসমাপ্ত.......
ঝিরি বর্ষা
মোঃ আশিক মোস্তফা


Powered by Blogger.